মাদককে না বলুন: পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা!

[X]

****সমস্যাঃ আমার বয়স ২৬ বছর। প্রায় ১০ বছর ধরে ফেনসিডিল নিচ্ছি। এই নেশা থেকে মুক্ত থাকতে চাই। কয়েকবার চেষ্টা করেও ছাড়তে পারিনি। এ বিষয়ে আপনাদের পরামর্শ চাই।

পরামর্শঃ ইচ্ছা করলে যেকোনো নেশা থেকে মুক্ত থাকা যায়। রোগী নিজ থেকে নেশা ছাড়তে চাইলে কাজটা সহজ হয়। আপনার ইতিবাচক দিক হলো, আপনি নিজেই নেশা ছাড়তে চাইছেন। চেষ্টা করেও তা পারেননি, কারণ ফেনসিডিল ছাড়ার পর যে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তৈরি হয়, তার যথাযথ চিকিৎসা করেননি। মাদকের ক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্র বলে একটা কথা আছে। যেমন মাদক গ্রহণকারী বন্ধুদের দেখলে; যে জায়গায় মাদক নেওয়া হয়, সেখানে গেলে এবং যে সময় মাদক নেওয়া হয়, সে সময় এলে মাদকের প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ বেড়ে যায়। ফলে এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। প্রিয়জনের কাছে থাকবেন। পরিবারকে জানান। এখানে লজ্জার কিছু নেই। এটা একটা রোগ। অন্য কোনো রোগ হলে কি আপনি লুকিয়ে রাখতেন? এখনই একজন চিকিৎসকের সাহায্য নিন। মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলে আপনার শরীর পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নেব।
****সমস্যাঃ আমি ভোলা থেকে বলছি। আমার বয়স ২৮ বছর। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ইয়াবা খাই। কিছুদিন খাওয়ার পর ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝতে পারি। এখন ছাড়তে চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না। কীভাবে ইয়াবা ছাড়তে পারব?

পরামর্শঃ ইয়াবা ছাড়তে চাইলে সহজে ছাড়া যায় না। ছেড়ে দিলে ঘুম ঘুম লাগে, নিজেকে শক্তিহীন মনে হয়। কোনো কিছুতে উদ্যম পাওয়া যায় না। সবকিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তখন রোগী আবার ইয়াবা নিতে বাধ্য হয়। আপনার জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, আপনি নিজেই ছাড়তে চাইছেন। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কোনো মাদকাসক্ত রোগী যদি নিজে ছাড়তে চায়, তাহলে সে অবশ্যই মাদক থেকে ফিরে আসতে পারে। আপনার পুরোনো বন্ধু, মুঠোফোন, টাকা, যে জায়গায় মাদক নিতেন, যে সময় মাদক নিতেন—এসব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কাজ না হলে ঢাকায় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চলে আসুন, আমরা আপনার চিকিৎসা করব।
****সমস্যাঃ আমি নীলক্ষেত থেকে বলছি। আমার স্বামী মাদকাসক্ত। কিছুদিন আগে পা ভেঙে গেছে। মাদক থেকে মুক্ত করে তাঁকে কীভাবে সুস্থ করে তুলতে পারি?

পরামর্শঃ এখন আপনার স্বামী অসুস্থ। বাইরে বের হওয়া সম্ভব হবে না। এ সময় মাদকের চিকিৎসা করিয়ে নিতে পারেন। বাসায় তাঁর আশপাশে কোনো মাদকদ্রব্য থাকলে সেটা সরিয়ে ফেলুন। তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করুন। তাঁর মন জয় করার চেষ্টা করুন। আপনার প্রতি, পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি তাঁর অনেক দায়িত্ব আছে। মাদকের মতো তুচ্ছ বস্তু গ্রহণ করে তিনি তাঁর জীবন নষ্ট করতে পারেন না। এভাবে তাঁকে বুঝিয়ে কোনো নিরাময়কেন্দ্রে আনার ব্যবস্থা করুন। চিকিৎসক তাঁকে পরীক্ষা করে ওষুধ দেবেন এবং কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলার পরামর্শ দেবেন। মাদকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হলে তাঁকে ভর্তি থাকতে হতে পারে।
****সমস্যাঃ আমি ভূতের গলি থেকে বলছি। আমার ভাই এক বছর হলো বিয়ে করেছে। সে প্রচুর ইয়াবা খায়। বাসায় ভাঙচুর করে। চিকিৎসা করাতে চায় না। অনেক টাকাপয়সা খরচ করে সে। আবার ব্যবসা করার জন্য টাকা চায়।

পরামর্শঃ মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসা করাতে চায় না। তারা মনে করে, তারা ভালো আছে। চিকিৎসার দরকার নেই। ভাঙচুর করবে, টাকা নষ্ট করবে, ব্যবসা করবে—নানা অজুহাত দেখাবে। তার সবকিছু মানা যাবে না। আবার সমালোচনা করারও দরকার নেই। ইয়াবা ধোঁয়ার মাধ্যমে ফুসফুস, রক্ত ও ব্রেনে যায়। এটা একটা মানববোমা। মানুষের মধ্যে ঢুকে মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। মাদকাসক্তির কারণে ধীরে ধীরে অমানুষে পরিণত হয়। তখন সে নানা ধরনের অমানবিক কাজ করতে থাকে। যে করেই হোক, চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।
****সমস্যাঃ আমি বনশ্রী থেকে বলছি। আমার ছেলের বয়স ১৮ বছর। সে গাঁজা খায়। খারাপ আচরণ করে। সবকিছুতে অনিয়ম করে। এখন কী করতে পারি?

পরামর্শঃ গাঁজা সম্পর্কেও কিছু মানুষের ভ্রান্ত ধারণা আছে। অনেকে এটাকে স্বাভাবিক নেশা মনে করে। কিন্তু গাঁজার মধ্যে ৬০ প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য আছে। গাঁজা ধোঁয়ার মাধ্যমে ফুসফুস, রক্ত ও মাথার কোষে প্রবেশ করে। ৬০ প্রকার রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে একটা খুবই ভয়ংকর ও বিপজ্জনক। এটাকে বলে টিএইচসি (টেট্রা হাইড্রো ক্যানাবিনওয়েড)। এটা একবার স্নায়ুকোষের মধ্যে ঢুকলে এক বছর থাকে। বিভিন্নভাবে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। ফলে মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। ঘুম, আচরণ ও যৌন সমস্যা তৈরি হয়। সন্দেহপ্রবণতা বেড়ে যায়। স্ত্রীসহ পরিবারের সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্সের একটা বড় কারণ গাঁজা সেবন। এ জন্য গাঁজাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। গাঁজা একটি বিপজ্জনক মাদক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায় গাঁজা সেবন থেকে মুক্ত থাকার চিকিৎসা আছে। দ্রুত কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
****সমস্যাঃ আমি শান্তিনগর থেকে বলছি। আমার ছেলের বয়স ২৯ বছর। ১০ বছর ধরে সে মাদকাসক্ত। ইদানীং সে ইয়াবা নিচ্ছে। এর আগে হেরোইনসহ প্রায় সব ধরনের মাদক নিয়েছে। কয়েকবার চিকিৎসা করিয়েছি। কিছুদিন ভালো থাকে। আবার মাদক নেয়। কী করব?

পরামর্শঃ ইয়াবাসহ যেকোনো মাদকই মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। চিকিৎসা করালে ভালো থাকে, আবার নেয়—মাদকাসক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অনেকবার এমন হতে পারে। হতাশ হলে চলবে না। ধৈর্য নিয়ে চিকিৎসা করালে রোগী ভালো হবেই। মাদকের চিকিৎসা কিছুটা দীর্ঘমেয়াদি। কোনো নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা করালেই রোগী ভালো থাকবে, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাকে হাসপাতালে কত দিন রাখবেন—তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর? হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র মাদকাসক্ত রোগীকে ভালো থাকার জন্য প্রস্তুত করে দেয়। কিন্তু ভালো থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। হাসপাতাল হচ্ছে চিকিৎসার প্রথম পর্যায়। হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর নতুনভাবে চিকিৎসা শুরু হয়—এটা হলো চিকিৎসার দ্বিতীয় পর্যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ের চিকিৎসা ভুল হলেই সে মাদকাসক্ত হবে। এ পর্যায়ে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। টাকা, মুঠোফোন, মাদকাসক্ত বন্ধু—সবকিছু থেকে তাকে মুক্ত থাকতে হবে।
****সমস্যাঃ আমি উত্তরা থেকে বলছি। আমার বয়স ২২ বছর। আমি ইয়াবা নিই। ছাড়তে চাই, কিন্তু পরিবারকে জানাতে চাই না। কী করতে পারি?

পরামর্শঃ বিভিন্ন কারণে মানুষ ইয়াবা নেয়। হতে পারে কৌতূহল কিংবা বন্ধুদের চাপ। আবার ইয়াবা সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণাও আছে। যেমন অনেকে মনে করে, ইয়াবা খেলে স্লিম হওয়া যায়, যৌনশক্তি বাড়ে, কাজে আনন্দ পাওয়া যায় ইত্যাদি। ইয়াবাসহ যেকোনো মাদক সেবন থেকে মুক্ত থাকতে হবে। এই মাদক গ্রহণের ফলে প্রচণ্ড বিষণ্নতা তৈরি হয়। একসময় মানসিক বৈকল্য দেখা দেয়। মেজাজ খিটখিটে হয়। ধীরে ধীরে মানুষ যৌনশক্তি হারিয়ে ফেলে। কোনো কাজের আগ্রহ থাকে না। কাজ করার শক্তিও থাকে না। শরীর দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়। আর দশটি অসুখের মতো এটিও একটি রোগ। আপনি পরিবারকে জানান। পরামর্শ করে দ্রুত কোনো চিকিৎসকের সাহায্য নিন। অথবা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে পারেন। এখানে বহির্বিভাগে মাত্র ১০ টাকায় আপনার শরীরের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। চিকিৎসকের পরামর্শমতো চিকিৎসা করলে দ্রুত সেরে উঠতে পারবেন।
****সমস্যাঃ আমার ছেলে প্রায় সাত বছর ধরে মাদক নেয়। চিকিৎসা করিয়েছি, ভালো হয় না। রাত জাগে। দিনে ঘুমায়। টাকাপয়সার জন্য সব সময় চাপ দেয়। পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করে না। শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। তার জন্য রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছি। আবার সে রংপুরে যেতে চায়। এখন কী করব?

পরামর্শঃ মাদকের চিকিৎসা করার পর যে কেউ আবার মাদকাসক্ত হতে পারে। এতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আপনাদের ধৈর্যের সঙ্গে সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। হতাশ হওয়ার কারণ নেই। চিকিৎসার মাধ্যমে মাদকাসক্ত রোগী নিশ্চিতভাবে ভালো হয়। এখন আপনার ছেলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। তাকে নিয়ে পারিবারিকভাবে বসতে হবে। তার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। সে মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। তার নিজের ওপর কীভাবে নিয়ন্ত্রণ আসে, সে ব্যাপারে চেষ্টা করতে হবে। তাকে যত দ্রুত সম্ভব কোনো চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। শ্যামলী মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আনতে পারেন। তাকে পরীক্ষা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব।
পরামর্শ দেন আহমেদ হেলাল ও মোহিত কামাল
গ্রন্থনা: আশফাকুজ্জামান
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ৩১, ২০১২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *